অপলের সংগ্রাম
______________________________________________________
| অপলের মনে হল একটা সাপ যেন ওর মেরুদন্ড বেয়ে এঁকেবেঁকে উপরে উঠছে, সরীসৃপটার রুক্ষ ত্বক ওর শরীরে ঘষা খায়, ওর সারা পিঠে ছড়িয়ে দেয় এক বিশ্রী অনুভূতি। ওর ঘাড়টা আড়ষ্ট হয়ে ওঠে, মাথার মধ্যে ভোতা একটা অনুভূতি। কয়েকটা মুহুর্তের জন্য নিজের অবস্থান এবং উদ্দেশ্য স্মরণ করতে পারে না ও। “কতক্ষণ ধরে গাড়ি চালাচ্ছ আজ?” একটা কণ্ঠস্বর হঠাৎ ভেসে এসে ওকে চমকে দেয়। ক্ষনিকের সেই অযাচিত ধোয়াচ্ছন্ন অনুভূতিটা যেমন আচমকা এসেছিল তেমনি আচমকাই উধাও হয়। কিছুদিন ধরে এই বিশেষ সমস্যাটা হচ্ছে, কখন কখন দিনে বেশ কয়েকবার। অদ্ভুত হলেও সত্য, এই রহস্যময় অনুভূতির কারণটা ও জানে। সবকিছু হারানোর ভীতিবোধ থেকে সৃষ্টি হচ্ছে সেই আতংকর অনুভূতি। প্রায় আট মাস ধরে রাইড শেয়ারে গাড়ি চালাচ্ছে। IT টেস্টার হিসাবে কাজটা হঠাৎ করেই চলে গেল। টরন্টোতে ইমিগ্রেশন নিয়ে আসার পর কয়েকটা বছর বেশ কষ্ট করেছিল, কাজটা পাওয়ার পর কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল, নতুন নতুন স্বপ্ন দেখছিল। কোন রকম পূর্বাভাস না দিয়েই হঠাৎ ছাটাই করা হল ওকে, সঙ্গে আরোও কয়েকজন। কম্পানীতে বেশ কিছুদিন ধরেই কাটছাট হচ্ছিল। সবাই ভয়ে ভয়ে ছিল কার পালা আসে। দূর্ভাগ্যবশত অপলের কপালেই ছিল দূর্ভোগ। খুব একটা অবাক হয় নি ও। ওর গ্রুপে ওরই কানাডিয়ান অভিজ্ঞতা ছিল সবচেয়ে অল্প। ও জানত সবার আগে ওর যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। বাস্তবে তাইই হল। আরেকটা কাজ পেতে সমস্যা হচ্ছে । বাজারে কাজ নেই তা নয় কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে চাকরী প্রার্থীর সংখ্যা বেশী, অনেকেরই অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ওর চেয়ে কৃতিত্বের বোঝা অনেক ভারী। পাল্লা দিয়ে কোথাও টিকতে পারছে না ও। “অনেকক্ষণ! অন্তত সেই রকমই মনে হচ্ছে।” আরোহীর প্রশ্নের জবাব দেয় ও। নিজের কানে নিজের কথাই ভারী, বিরক্তিকর শোনায়। মনে হয় কথাটা যেভাবে বলতে চেয়েছিল, ঠিক তেমনটা শোনায় নি। গাড়ীর আরোহী তার ক্লায়েন্ট। তার কাছে নিজের আভ্যন্তরীণ হতাশাকে প্রকাশ করাটা বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ নয়। ড্রাইভার রেটিংয়ের গুরুত্ব আছে। আরোহীর প্রফুল্লতা এবং উত্তম রেটিংয়ের মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই সে কথা কে হলপ করে বলতে পারে? আরোহী ভদ্রলোক আলাপ চালিয়ে যায় না। পেছনে না তাকিয়ে কিংবা রিয়ার ভিউ মিররে নজর না বুলিয়েও অপল বলে দিতে পারে ভদ্রলোক তার দিকেই তাকিয়ে আছে, দু ঠোঁটের ডগায় সম্ভবত ঝুলছে এক টুকরো দর্পিত হাসি। পঞ্চাশোর্ধ, বর্ণ বাদামী, কালো সানগ্লাস পরিহিত লোকটার আচার আচরণে কেমন একটা ধুর্ততার ছাপ। কথাটা ভাবার পর নিজের কাছেই কিঞ্চিত অপরাধী বোধ করে অপল। মানুষের বাইরেরটা দেখে কাউকে যাচাই করাটা তার স্বভাব নয়। হতে পারে লোকটার হাসি কিংবা চালচলন নয় বরং অপলের নিজের ভেতর থেকে ক্রমশ উদ্গীরিত ভীতিবোধই ওর চারপাশের পরিতৃপ্ত, সফল মানুষদেরকে অযাচিতভাবে হীন দৃষ্টিতে দেখার ইন্ধন জোগাচ্ছে। ট্রিপটা বেশ ছোট, অধিকাংশ উবার ট্রিপের মতই। একটা ম্যনসনের মত বিশাল বাড়ীর গেটে লোকটাকে নামাল অপল। পরণের দামী জ্যাকেট, দামী স্নো বুট, সর্বশেষ মডেলের এপল ওয়াচ, এবং গুচি সানগ্লাসে তাকে দেখেই মনে হচ্ছে সে খুব সফল কেউ হবে। সে কি লোকটাকে হিংসা করছে, নিজেকেই প্রশ্ন করে অপল। হয়ত সামান্য একটু। আসলে এখন ওর মনের যে অবস্থা তাতে একটু নয়, উত্তরটা হবে – অনেক। এইভাবে রাস্তায় রাস্তায় আরোহী নিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ট্রিপ দিয়ে যে অর্থ পাওয়া যায় সেটা অপলের কাছে প্রীতিকর কিংবা যথেষ্ট মনে হয় না। পরবর্তি আরোহীকে তোলার জন্য যখন আবার চলতে শুরু করে ওর পিঠের সেই সরিসৃপীয় অনুভুতিটা আবার ফিরে আসে। গাড়ি চলছে তো চলছে তো চলছে। নতুন নতুন ক্লায়েন্ট, এখান থেকে সেখানে, সেখান থেকে ওখানে। ছোট ছোট ট্রিপ। চুপচাপ। সেটাই ওর পছন্দ। যে সব আরোহীরা কথা বলতে পছন্দ করে তারা অনেক সময় তাদের জীবনের কিছু কিছু গোপন কথা ওর কাছে ফাঁস করে, কোন একটা কৌতুক বলে তার সাথে কন্ঠ মিলিয়ে হাসতে চায়, তার কাছ থেকে কিছু একটা প্রতিক্রিয়া আশা করে। অপলের সেসব কিছুই ভালো লাগে না। ওর নিজেরই এখন এক হাজার একটা সমস্যা, সেই সব নিয়ে অপরিচিত কোন মানুষের সাথে আলাপ করবার মত মন-মানষিকতা ওর নেই। ড্রাইভ করতে করতে কেন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়, মনে হয় কি যেন ও ভুলে যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ওর খেয়াল হচ্ছে না। কি সেটা? গাড়ি চালাতে চালাতে আগের রাতে চাকরীর ইন্টারভিউ দেবার জন্য যা যা পড়েছে সেই সব মনে করবার চেষ্টা করে। আগের চাকরীটা চলে যাবার পর বেশ কয়েক মাস ও কোন ইন্টারভিউয়ের ডাকই পায় নি। কিন্তু অকস্মাৎ যেন সেই দুর্ভাগ্যের যবনিকাপাত হয়েছে। একটি নয়, দুটি ইন্টারভিউয়ের ডাক এসেছে ওর। আহ, ভাবতেও মনটা কেমন যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে। এতো দিন ধরে গভীর রাতে রেজুমে ঘাটতে ঘাটতে আর নানা ধরনের পরিবর্তন করতে করতে ও শুধু ভেবেছে ওর রেজুমে লেখার অক্ষমতার জন্যই কোথাও থেকে ডাক আসছে না। আর কিছু না হোক সেই সন্দেহের অবকাশ অন্তত তো হয়ছে। ইন্টারভিউ পেলেই তো আর কাজ হয় না কিন্তু ইন্টারভিউ না পেলে তো কাজ পাবারতো কোন সম্ভাবনাই থাকে না। একটা স্ট্রিপ মলের পার্কিং লটে গাড়ি রেখে, ড্রাইভিং সিটে বসে নিজের ঘড়ির টিক টিক শব্দ শোনে অপল, প্রতীক্ষার ক্ষণ যায় খুব ধীরে ধীরে। বিকাল দুইটা দশ বাজে। ইন্টারভিউ নেবার জন্য যে ভদ্রমহিলার ওকে দু’টার সময় ফোন দেবার কথা ছিল তিনি এখনও ফোন দেন নি। আজকের দুইটা ইন্টারভিউয়ের প্রথমটা ঐ ভদ্রমহিলার সাথে। তিনি আবার অন্য কোন কাজে ব্যাস্ত হয়ে গিয়ে থাকলে কিংবা ভুলে গিয়ে থাকলে খুবই সমস্যা। কিন্তু তেমনটা হবার তো কথা নয়। কোন কারণে তার পরিকল্পনার যদি পরিবর্তন হত তাহলে তিনি তো অপলের এজেন্টকে সেটা জানাতেন, তাই না? অপল জানতে পারত তার এজেন্টের কাছ থেকে। আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর কিইবা করার আছে? অপেক্ষার ক্ষণ গুনতে গুনতে আবার সেই অনুভূতিটা ফিরে এলো। কি যেন একটা ও ভুলে যাচ্ছে। খুব চেষ্টা করেও সেই অদ্ভুত মানসিক অনুভূতিটা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে পারে না, একটা দুই ডাইমেনশনাল কার্টুন চরিত্রের মত সেটা তার সাথে লটকে থাকে। ভদ্রমহিলা দেরীতে হলেও শেষ পর্যন্ত ফোন করলেন, ইন্টারভিউও এক সময় শেষ হল। মহিলা নিশ্চয় ওর মরিয়া মনভাবের ইঙ্গিত পেয়ে থাকবেন তার প্রতিটি প্রশ্নের সুদীর্ঘ উত্তরে, যেন নিজেকে প্রমাণ করবার জন্য অপল অতিমাত্রায় ব্যাগ্র। শব্দবহুলতা সবার কাছে পছন্দনীয় নয়। ইন্টারভিউ শেষে ভদ্রমহিলা পুনরাবৃত্তি করেছেন গত বাঁধা সেই কথা যা এর আগেও বহুবার শুনেছে অপল …আরোও বেশ কয়েকজন চাকরী প্রার্থীর ইন্টার্ভিউ নেয়া বাকী। কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে অপলের এজেন্সিকে জানানো হবে। অপল একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে। যেভাবে দ্রুত টেকনিক্যাল জ্ঞানের পরিবর্ধন হচ্ছে তাতে নিজেকে সম্ভবমত নানান কিছুতে ওয়াকিবহাল রাখা সহজ কাজ নয়। যে কারণে প্রকৃত অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেকখানি বাড়িয়ে বলা কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কথা বলার মধ্যে দোষের কিছু নেই। ইন্টারভিউতে যেসব বিষয়ে ওর অভিজ্ঞতা আছে বলে ও দাবী করে তার অনেক কিছুতেই ও কখনই কাজ করে নি। ইন্টারনেট ঘেটে ঘেটে জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়েছে যেন বিশ্বাসযোগ্য করে বলতে পারে। ইন্টারভিউয়ের সময় বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে বলতে ক্লান্তি লাগে। ইন্টারভিউ শেষ হলে যে কারণে স্বস্তি পায়, মনে শান্তি লাগে। দ্বিতীয় ইন্টারভিউটা হবার কথা তিনটায়। সেটাও দেরী হচ্ছে। জনৈক জেমস হ্যাসের তাকে ফোন করার কথা। তিনিও কি ভুলে গেলেন? সারা পৃথিবী যেন ওর কাজের বেলাতেই কেমন মনভোলা হয়ে উঠেছে। ফোনের প্রতীক্ষায় বসে থকতে থাকতে মাথার মধ্যে ইন্টারভিউয়ের নানা ধরনের প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করতে থাকে অপল, শেষ বারের মত প্রাকটিস করে, নিশ্চিত হয় যেন কোন ভুল্ভাল তথ্য না দিয়ে দেয়। কোন অবস্থাতেই নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না। কাজ পাবার জন্য এই জাতীয় প্রহেলিকার আশ্রয় সবাই কম বেশী নেয়। একটু বৃহত্তর ভাবে চিন্তা করলে, এটা অন্যান্য প্রার্থীদের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বীতা, হার জিতের প্রশ্ন অবধারিত ভাবে চলে আসে। এটা শুধু চাকরীর ইন্টারভিউ নয়, বরং জীবণ মরণের এক খেলা। কি যেন একটা ভুলে যাচ্ছে…সেই অদ্ভুত চিন্তাটা আবার ওকে গ্রাস করে। কি হতে পারে? দিন দুইয়ের মধ্যে বাড়ীর মর্টগেজ দিতে হবে, সপ্তাহ খানেক পরে গাড়ীর পেমেন্ট, এই মাসের ইউটিলিটি বিল সব ইতিমধ্যেই দিয়ে দিয়েছে… তবে কি প্রপার্টি ট্যাক্সের পরের কিস্তি দেবার সময় হয়ে গেছে? নাকি কোন ক্রেডিট কার্ড পেমেন্ট বাকী রয়ে গেছে? দেরী করে ফেললে অকারণে এক গাদা টাকা গুনতে হবে লেট পেমেন্টের জরিমানা হিসাবে – ওর ঘন্টা দুই তিনের কাজের উপার্জনের সমান। কি ভুলে যাচ্ছে? মাথা চুলকায় ও, মনের গভীরে ডুব দেয়, তন্ন তন্ন করে খোঁজে স্মৃতির কিনারে কিনারে। মেরুদন্ডের সেই সরিসৃপীয় অনুভুতিটা আবার ফিরে আসছে, তার মনের মধ্যে হতাশার বুদবুদ সৃষ্টি হচ্ছে। আর কতদিন চলবে এভাবে? আর কদিন পরেই হয়ত সব পেমেন্ট করার সামর্থ ওর থাকবে না। ইতিমধ্যেই মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে ঋণের জন্য। জেমস প্রায় পনের মিনিট পরে কল করলেন। দেরীর জন্য ক্ষমা চেয়ে দ্রুত ইন্টারভিউতে মনযোগ দিলেন তিনি। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেন তিনি, নানাভাবে অপলের অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করতে থাকেন, অপলও সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকে নিজেকে অভিজ্ঞ, যোগ্য প্রার্থী হিসাবে প্রমাণিত করতে। মিনিট বিশেক আলাপ করার পরই হঠাৎ থেমে গেলেন জেমস, জানতে চাইলেন অপল মুখোমুখি বসে ইন্টারভিউ দিতে আগ্রহী কিনা। এটা খুবই ভালো লক্ষণ। অপল পরের দিনেই দেখা করতে আগ্রহী কিন্তু জেমস তাকে পরের সপ্তাহে আসতে বললেন। পরবর্তি সপ্তাহ আসার আগেই অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে, জেমসের হয়ত অন্য কোন প্রার্থীকে পছন্দ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু তারপরও মুখোমুখী ইন্টারভিউয়ের ডাক পাওয়া একটি আশাব্যঞ্জক ব্যাপার। উবারের এপ-টা চালিয়ে দিয়ে আবার ড্রাইভিংয়ে ফিরে যায় অপল। স্ত্রীর ফোন আসে। ইন্টারভিউ কেমন হয়েছে জানার জন্য উদ্বিগ্ন। কোন সুখবর আছে কি? মুখোমুখি ইন্টারভিউয়ের ডাক পাওয়া তো ভালো সম্ভাবনারই ইংগিত, নয় কি? অপল স্ত্রীকে আশ্বাস দেয়, একটা চাকরী ওর এবার হবেই। স্ত্রীর শান্ত কন্ঠস্বর ওকে শক্তি দেয়, এগিয়ে যাবার ইন্ধন যোগায়, ট্রিপ থেকে ট্রিপে, এখান থেকে সেখানে, সেখান থেকে ওখানে। পয়তাল্লিশ বছর বয়েসে এই কাজ করতে করতে তার মনে হয় তার অধঃপতন হয়েছে, ক্রমশ তলিয়ে চলেছে সে, তার শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার যোগ্য মূল্য সে পাচ্ছে না। পত্নীর সাথে কথপকথন তার হতাশাকে কিঞ্চিৎ হলেও ম্লান করে দেয়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নতুন করে দেখায়। বাসায় ফিরে সেই সুন্দর মুখখানা দেখার জন্য মনটা আকুল হয়ে ওঠে, তাকে দুই বাহুর মধ্যে টেনে নেবার জন্য মনটা আনচান করে। যমজ মেয়ে দু’টি বড় হবার পর তাদের সামনে আর আগের মত ভালোবাসার প্রদর্শন করা যায় না। দেখলেই দু’জন হেসে কুটিপাটি হয়। নিজের সংসারের কথা ভাবলেই মনটা ভালো হয়ে যায় অপলের। এই দূর্যোগের মধ্যেও তাদের সুখের সংসারে কোন চির ধরে নি, ধরতে সে দেবেও না। অবশেষে কাজ শেষ করে সেদিনের মত যখন বাসায় ফেরে অপল তখন অনেক রাত। স্ত্রী বাচ্চাদেরকে অনেক আগেই বিছানায় পাঠিয়ে দিয়ে দু’জনের রাতের খাবার টেবিলে বেড়ে তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। অপল অসম্ভব ক্লান্ত, পত্নীর ঘুম ঘুম চোখ, তারপরও দুজনে পাশাপাশি বসে সেই ঠান্ডা খাবারই খায়, গরম করতে ইচ্ছা হয় না, নীচু স্বরে আলাপ হয়, কেমন গেছে দিনটা তাই নিয়ে, বাচ্চাদের নিয়ে, কাজ পাওয়া নিয়ে, বিল দেয়া নিয়ে। খাবারের পর দু জনে প্রতিদিনের মত বসে টেলিভিশনের সামনে, মুহুর্তের মধ্যেই অপলের শরীরটা ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়ে, স্ত্রীর কাঁধে মাথা রেখে অঘোর ঘুমে তলিয়ে যায়। স্বপ্ন দেখে এক শূণ্য কুয়াশাছন্ন রাস্তায় একাকী হেঁটে যাচ্ছে ও, কি যেন মনে করার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না। যখন একটা কোমল হাত ওর মুখ ছুঁয়ে যায় এবং একটা শান্ত কন্ঠস্বর ওকে ঘুম থেকে ওঠার জন্য অনুরোধ করে ওর মনে হয় যেন একটা স্বপ্ন থেকে আরেকটা স্বপ্নে প্রবেশ করেছে ও। স্ত্রীর হাত ধরে ঘুমের মধ্যেই হেঁটে ডাইনিং রুমে যায় যেখানে ওদের দুই কন্যা তাদের ঘুমের পোষাকে ঢুলু ঢুলু চোখে একটা বিশাল চকলেট কেকের সামনে দাঁড়িয়ে, অপলের প্রিয় কেক, উপরে মোমের নাম্বারে ২ এবং ০ প্রবিষ্ট এবং সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা শুভ বিবাহ বার্ষিকী। “কি হচ্ছে?” জানতে চায় অপল, এখনও ঘুমের ঘোরে, তার চারপাশের ঘটানা স্রোত এখনও ওর বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। “গতকাল আমাদের বিবাহ বার্ষীকি ছিল,” স্ত্রী শান্ত কন্ঠে বলে। “ওরা দু জন মিলে কেকটা বানিয়েছিল। অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল তোমার ফেরার জন্য।“ এবার অপলের স্বরণ হয়। সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছে কিন্তু তারপরও কিছু প্ল্যান করেছিল দিনটা উদযাপন করার। স্ত্রী সুশি খেতে পছন্দ করে আর মেয়েরা মুভি দেখতে চায় থিয়েটারে গিয়ে। ঝট করেই ওর ঘুম ছুটে যায়, গভীর লজ্জা ওকে গ্রাস করে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে স্ত্রী ওকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দেবার প্রয়াস করে। দুই কন্যা তাই দেখে চোখ ঘোরায়, খিল খিল করে হাসে দুই হাতে মুখ ঢেকে। “ফু দাও!” দুই জনে একযোগে অনুরোধ করে। “দুই জন একসাথে ফু দাও!” অপল এবং তার স্ত্রী এক যোগে ফু দেয় কিন্তু ম্যাজিক মোমবাতিগুলো নেভাতে পারে না। তারা বার বার জ্বলে উঠতে থাকে। তাই নিয়ে একটা হাসির হিড়িক পড়ে যায়। একটার পর একটা ছবি তোলা হয়, কেক কাটা হয়, সবাই মিলে খাওয়া হয়, সেই হাস্যময় উচ্ছল আনন্দের ক্ষণ্টুকুকে প্রাণ ভরে উপভোগ করে ওরা সবাই। তারপর মেয়েরা বাবা-মাকে আলিজ্ঞন করে চলে যায় ঘুমাতে আর অপল তার বধূকে জড়িয়ে ধরে এবং তার ঠোঁটে একে দেয় প্রেমময় এক চুম্বন। |